Notice :
আমাদের সাইটে আপনাদের স্বাগতম
ঋণের সুদহার না কমে আরও বেড়েছে

ঋণের সুদহার না কমে আরও বেড়েছে

বেসরকারি খাতের একটি বড় ব্যাংক গত মাসে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের সব ধরনের ঋণে সুদ নিয়েছে ৯ থেকে ১২ শতাংশ। এক মাস আগে ব্যাংকটি ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করে। আরও কয়েকটি ব্যাংক আগস্টে শিল্প ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে। জুলাইতেও কোনো কোনো ব্যাংক সুদহার বাড়িয়েছিল এবং কয়েক মাস ধরে ঋণের সুদহার কমাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন করে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর মাঝেই সুদহার না কমে উল্টো বাড়ছে।

ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে ব্যাংকগুলো। তবে ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে তাদের প্রতিশ্রুতির কথা একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো কিছুতেই কমছে না সুদহার। সুতারং ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় সুদহার বাড়িয়ে চলেছে। এখন বিভিন্ন করপোরেশনের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি খাতে নেওয়ার জন্য আইন হচ্ছে। এর ফলে তারল্য সংকট তীব্র হয়ে সুদহার আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে আমানত এবং সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয় ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি এবং গত ৫ আগস্ট অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকে বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত কার্যকরের পরামর্শ দিয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক খাতে তারল্যের ওপর যে চাপ রয়েছে, তাতে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ ৬ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানত পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, জোরাজুরি করে বা সুবিধা দিয়ে সুদহার কমানো যায় না। বেশি চাপ দিলে হয়তো আমানতকারীকে ঠকিয়ে ব্যাংকগুলো সুদহার কমাবে এবং সুদহার কমাতে চাইলে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, যেভাবেই হোক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে। এতে প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য খরচ কমবে এবং তহবিল সংকট থাকবে না। দ্বিতীয়ত, সাজসজ্জার পেছনে ব্যাংকের বাহুল্য খরচ কমাতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর উচ্চ মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুদহার নিম্নমুখী ধারায় রাখতে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতে সুদহারের সর্বোচ্চ গড় ব্যবধান ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা রয়েছে। আবার উচ্চ সাজসজ্জায় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে খরচ কমানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ঋণের সুদহারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে বছরে এক শতাংশের বেশি সুদ না বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। অন্য এক নির্দেশনার মাধ্যমে অন্য যে কোনো ঋণের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি সুদ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগ ব্যাংক এসব নির্দেশনা মানছে না।

বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ করেছে ১১ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিয়েছে কোনো কোনো ব্যাংক। বাড়ি ও গাড়ি কেনার ঋণে সুদহার এখন ১২ থেকে ১৭ শতাংশ। আর ক্রেডিট কার্ডে অধিকাংশ ব্যাংকের সুদহার ১৮ থেকে ২৭ শতাংশ। সরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলো অবশ্য উৎপাদনশীল খাতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে শুধু বেসিক ব্যাংক এসএমই খাতের চলতি মূলধন ঋণ বিতরণ করছে সাড়ে ১২ থেকে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে এবং রূপালী ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণ ও আবাসন ঋণে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। তবে ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং নানা জটিলতার কারণে অনেক সময় উদ্যোক্তারা সরকারি ব্যাংকে যেতে আগ্রহ দেখান না।

জানতে চাইলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, সুদহারের বিষয়টি নির্ভর করে বাজার চাহিদার ওপর। চাহিদা বেশি থাকায় এমনিতেই আমানত ও ঋণের সুদহার আশানুরূপভাবে কমছে না। এর মধ্যে আবার বিভিন্ন করপোরেশনের টাকা তুলে সরকারি হিসাবে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন করা হলে সংকট আরও বাড়বে। অবশ্য এটা ঠিক, ঠিকাদারদের মাধ্যমে ঘুরেফিরে এসব অর্থ আবার ব্যাংকিং চ্যানেলে আসবে। তবে এতে ছয় মাসের একটি গ্যাপ তৈরি হবে। এই সময়টাতে চাপ বাড়বে।

ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার গত বছরের ২০ জুনের এক বৈঠকের পর ঘোষণা দেন, একই বছরের ১ জুলাই থেকে এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ করবে সব ব্যাংক। আমানত নেওয়া হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে। আর এ জন্য সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার ঘোষণা দেয় সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা বা সিআরআর সংরক্ষণের হার সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করা হয়। আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার ‘রেপো’ সুদহার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামানো হয়। তবে এর আগের বছর ব্যাংকের করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ করে সরকার। ২০১৫ সাল পর্যন্ত করপোরেট করহার ছিল সাড়ে ৪২ শতাংশ। সরকারের এত সুবিধা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ব্যাংকগুলো এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ করবে, যা শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক হবে। এ ছাড়া ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক এবং একজন পরিচালক টানা ৯ বছর থাকার সুযোগ দিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়েছে।

এখান থেকে শেয়ার দিন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2019 agambarta24.com
Design BY NewsTheme