Notice :
আমাদের সাইটে আপনাদের স্বাগতম
রক্তশূন্যতা : লক্ষণ, কারন ও করনীয়

রক্তশূন্যতা : লক্ষণ, কারন ও করনীয়

বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী রক্তের লোহিত কণিকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ হিমোগ্লোবিনের চেয়ে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যাওয়ার অবস্থাকে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া বলে। রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া মানে কিন্তু রক্ত কমে যাওয়া নয়। সাধারণত গর্ভবতী মা ও নারীরা রক্তশূন্যতায় বেশি আক্রান্ত হয়। রক্তশূন্যতা কখনো কখনো মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে। গর্ভকালীন অধিক মৃত্যুহারের প্রধান একটি কারণ রক্তশূন্যতা। বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হয়। সাধারণত জন্মের সময় নবজাতক শিশুর শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ২০০ গ্রাম/লিটার। পরবর্তীকালে ৩ মাস বয়স থেকে তা কমতে শুরু করে এবং প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে হিমোগ্লোবিন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ১৩০ থেকে ১৮০ গ্রাম/লিটার আর মহিলাদের ক্ষেত্রে ১১৫ থেকে ১৬৫ গ্রাম/লিটার। পুরুষ কিংবা মহিলা যে কারও ক্ষেত্রেই, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম/লিটার হয়, তবে এটা মারাত্মক অ্যানিমিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।

রক্তশূন্যতার কারণ

বিভিন্ন কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। যেমন-

  • খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ লৌহের যোগান না পেলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। সাধারনত প্রাণীজ খাবারের তুলনায় উদ্ভিজ্জ খাবারে লৌহের যোগান কম থাকে তাই, প্রাণীর কলিজা এবং লাল মাংস ইত্যাদি লৌহ সমৃদ্ধ খাবার না খেলে শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদী কোনও রোগ, প্রোটিন বা আমিষ জাতিও খাবার কম খেলে, হজমে সমস্যা, পাকস্থলীর বাইপাস অপারেশন ইত্যাদি কারনে পাকস্থলির খাবার থেকে লৌহ শোষণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং এর ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
  • অস্থিমজ্জায় লোহিত রক্তকণিকা কম তৈরি হলে। এর কারণগুলো হল— অস্থিমজ্জার স্বল্পতা, লৌহ, ভিটামিন বি১২ অথবা ফলিক এসিডের অভাব (মাসিক, গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ জনিত কারনে); দীর্ঘস্থায়ী জীবাণু সংক্রমণ, রঞ্জন রশ্মি বা তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব, থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ বা লিভারের অসুখ, বিভিন্ন প্রকার ওষুধ সেবন, কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার ইত্যাদি।
  • অতিরিক্ত পরিমাণে লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে অথবা জন্মগতভাবে লোহিত কণিকাতে ত্রুটি থাকলে।
  • আঘাতজনিত কারণে সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ, পাইলস, পেপটিক আলসার, বক্র কৃমির সংক্রমণ, মহিলাদের ক্ষেত্রে, মাসিকের সময় অধিক রক্তক্ষরণ, ঘন ঘন গর্ভধারণ ও প্রসব ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ

সাধারণত অল্প পরিমাণ রক্তশূন্যতায় উপসর্গসমূহ সহজে বোঝা যায় না। রক্তশূন্যতা প্রকট হলে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—

  • স্বল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট।
  • হাতে পায়ে ঝিনঝিন করা আথবা অবশ ভাব।
  • মাথা ঝিম ঝিম ভাব।
  • অবসাদগ্রস্থ
  • মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা অথবা দুর্বল বোধ করা।
  • চোখে ঝাপসা দেখা।
  • মেজাজ খিটমিটে হয়ে যেতে পারে।
  • স্মরণশক্তি কমে যেতে পারে।
  • মাথা ব্যথা
  • মুখের কোণায় ঘা হয়।
  • জিহ্বায় ঘা বা প্রদাহ।
  • মাথা ঘোরা
  • বুক ধড়ফড় করা।
  • হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে, ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলা বা বুকে চাপ অনুভব করা এবং বুকে ব্যথা অনুভব করা ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ।
  • খাদ্য গিলতে অসুবিধা।
  • হাত, পা অথবা সমস্ত শরীর ফ্যাকাসে হয়ে আসা।
  • অস্বাভাবিক খাদ্যের প্রতি আসক্তি জমায়।
  • নখের ভঙ্গুরতা ও চামচের মতো আকৃতির নখ হয়ে যাওয়া।

যাদের রক্তশূন্যতা হতে পারে
যারা দীর্ঘদিন ধরে একই রোগে ভুগছেন, গর্ভবতী মহিলা, ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে, কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে, লৌহ, ফলেট ও ভিটামিন বি-১২ সমৃদ্ধ খাবার কম খেলে এবং কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বেশি থাকে।

রক্তশূন্যতায় করনীয়

  • দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক কোনও রোগে ভুগলে শরীরে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন কমে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করতে হবে।
  • কিছু ঔষুধ এবং খাবার যেমন- দুগ্ধজাতীয় খাবার, এন্টাসিড ওষুধ, চা ও কফি ইত্যাদি মানুষের পাকস্থলিতে অন্যান্য খাবার হতে লৌহ শোষণের মাত্রা কমিয়ে দেয়। সুতরাং, লৌহ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের আগে ও পরে এসব ঔষুধ অথবা খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • খাবারে ফলেট ও ভিটামিন বি-১২ এর পরিমান কম থাকলে এসবের অভাবে শরীরে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন কমে যেতে পারে। প্রাণীজ আমিষ যেমন- কলিজা, মাংস ইত্যাদিতে প্রচুর ভিটামিন বি-১২ আছে এবং যা মানব দেহ খুব সহজে গ্রহন করতে পারে। আবার সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, শিমের বিচি, ছোলা, ডাল ইত্যাদিতে প্রচুর ফলেট আছে। তাই এসব খাবার সঠিক মাত্রায় গ্রহন করতে হবে।
  • অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের (অপারেশন, দুর্ঘটনা জনিত জখম, ঋতুস্রাব কালিন অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) ফলে রক্তশূন্যতা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে রক্ত ও ওষুধ গ্রহন করতে হবে।
  • থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর শরীরে রক্তকণিকার উৎপাদন কম হওয়ায় এ রোগে আক্রান্তদের নিয়মিতভাবে রক্ত গ্রহন করতে হয়।
  • এপ্লাস্টিক এনেমিয়া রোগে মানুষের অস্থিমজ্জা হতে রক্ত কনিকা উৎপাদনের মাত্রা কমে যায়। সাধারনত ক্যান্সার এর চিকিৎসায়, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি গ্রহনের সময় কিংবা ভাইরাসের সংক্রমনে রক্ত কনিকা উৎপাদনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে রক্ত ও ওষুধ গ্রহন করতে হবে।

রক্তশূন্যতায় কি কি পরীক্ষা করতে হতে পারে?
রক্তশূন্যতার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করতে হতে পারে, যেমন— রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম, অস্থিমজ্জা পরীক্ষা, মাথার এক্স-রে এবং চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে কিছু বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার চিকিৎসা
লৌহের অভাবজনিত রক্তশূন্যতায় আয়রন ট্যাবলেট খেতে হবে। ভিটামিন বি১২ বা ফলিক এসিডের অভাবজনিত রক্তশূন্যতায় ভিটামিন বি১২ বা ফলিক এসিডের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। যদি রক্তশূন্যতা অত্যন্ত প্রকট আকার ধারন করে, তবে অনেক ক্ষেত্রে, দ্রুত সাময়িক উন্নতির জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হবে। গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা এবং শিশুদের অধিকাংশই সাধারণ রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হয়। রক্তশূন্যতা রোধে গর্ভবতী মা ও শিশুদের লৌহ ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, যেমন- কচু, ধনেপাতা, আটা, কালোজাম, চিড়া, শালগম, কলিজা, চিংড়ি, ডাঁটা শাক, আমচুর, পাকা তেঁতুল, ফুলকপি এবং শুঁটকি মাছ ইত্যাদি বেশি বেশি করে খেতে দিতে হবে। গর্ভবতী মাকে গর্ভের চতুর্থ মাস থেকে আয়রন ট্যাবলেট খেতে দিতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে, কৃমি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধান প্রধান রক্তশূন্যতাজনিত রোগ

দেহে আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতাঃ বেশির ভাগ মানুষই দেহে লৌহ বা আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকেন। অনুন্নত, অপরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্য সচেতনতাবর্জিত জনপদে এ রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। আয়রন বা লোহ ঘাটতির প্রধান কারণসমূহ হল উঠতি বয়সে শিশুদের খাবারে প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন না থাকলে, মহিলারা গর্ভাবস্থায়, সন্তান জন্মদানের পরে শিশুকে দুগ্ধ পানের সময়ে প্রয়োজনীয় আয়রন সমৃদ্ধ খাবার না খেলে, কৃমি দ্বারা সংক্রমিত হলে, পেপটিক আলসার ডিজিস, পাইলস হেমরয়েড, ক্রনিক লিভার ডিজিস, পাকস্থলীর অপারেশনের পর, পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সার ইত্যাদি।

থ্যালাসেমিয়াঃ প্রয়োজনমতো হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষণ না হওয়ার জন্য থ্যালাসেমিয়া হয়। থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত সমস্যা। সাধারণত শিশু বয়সেই এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন অথবা নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হয়। রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।

এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়াঃ জন্মগত ও জন্মপরবর্তী সময়ে কোনো কারণে অস্থিমজ্জা শুকিয়ে গেলে এ রোগ হয়। রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণসমূহের সাথে গলা ব্যথা, ঘন ঘন জ্বর, মুখে ঘা, মুখে ও গলায় সাদা দাগ দেখা যেতে পারে। এছাড়াও, রক্তক্ষরণজনিত লক্ষণ যেমন— নাক দিয়ে রক্ত পড়া, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, ত্বকের নিচে লালচে দাগ, প্রস্রাব ও পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ইত্যাদি এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়া রোগের লক্ষণ। এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর বয়স ২০ বছরের নিচে হলে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করতে হয়।

ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়াঃ লিউকেমিয়া যা মূলত ব্লাড ক্যান্সার হিসেবেই আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। এটা রক্তের একটা ক্যান্সার, যেখানে রক্ত তৈরির আদিকোষগুলো বিশেষ করে শ্বেত রক্তকণিকা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং অপরিপক্ব শ্বেত রক্তকণিকায় আমাদের রক্ত ভরে যায়। এ রোগে নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্তের হার বেশি।

লিউকেমিয়াকে সাধারনভাবে একিউট লিউকেমিয়া এবং ক্রনিক লিউকেমিয়া এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ইকিউট লিউকেমিয়া সাধারণত ১ থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের হয়ে থাকে, বিশেষ করে একিউট লিম্ফোব্লাসটিক লিউকেমিয়া বেশি হয়ে থাকে। এটি অতি দ্রুত শরীরের সমস্ত অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ রোগ ধরা না পরলে এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অপরদিকে ক্রনিক লিউকেমিয়া সাধারণত একটু বেশি বয়সে হয়ে থাকে এবং এটা অনেকটা ধীর গতিতে শরীরকে আক্রান্ত করে।

লিউকেমিয়া রোগের কারণ
এ রোগের আসল কারণ কি সে বিষয়ে জানা না গেলেও মূলত নিম্নলিখিত কারণে এ রোগ হতে পারে—

  • সাইটোটক্সিক ড্রাগ
  • ক্যান্সারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহারের ফলে এই রোগ হতে পারে।
  • কিছু কিছু ভাইরাসকে এই রোগের জন্য দায়ী করা হয়।
  • কিছু জন্মগত রোগ যেমন- ডাউন সিনড্রোমের রোগীদের এ রোগ বেশি হয়।
  • বিভিন্ন রকম কেমিক্যাল বিশেষ করে বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে লিউকেমিয়া রোগটি বেশি হচ্ছে।
  • রেডিয়েশন ও রঞ্জনরশ্মি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর রেডিয়েশনের কারনে জাপানীদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ খুব বেড়ে যায়।

এখান থেকে শেয়ার দিন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2019 agambarta24.com
Design BY NewsTheme